Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ বেশিদিন আগের কথা নয়। বাবা-মা কিংবা বয়স্ক আপু কিংবা ভাইয়ের কাছেই ভালোবাসার গল্প শুনলে পুরনো ঘ্রাণ পাওয়া যাবে। আজকের মতো ভালোবাসা ওতটা উন্মুক্ত ছিল না। তবু শুনলে কেমন গল্পের ঘোর লেগে থাকে। মনে হয় সম্ভব না। তবুও তো টিকে গেলো। কারণ ভালোবাসার ক্ষেত্রে তখন ছিল নানা সীমাবদ্ধতা। চিঠির খাম, হাতের লেখা কিংবা মসৃণ পিচের দিকে তাকিয়ে দুজনের হেঁটে চলা ফুটপাত সাক্ষী। পার্কে দুজনে বসে তখন কথা বলার চাইতে আশপাশে মানুষ কিভাবে তাকাচ্ছে তা নিয়েই দুজনকে ভাবতে হতো। এক অদ্ভুত লজ্জার মধ্যে দুজনের প্রেম সার্থক রূপ পেয়ে যেতো কিভাবে যেন। ভালোবাসার মানুষের মধ্যে সম্মানের জায়গাটুকু হারায় নি। ভালোবাসার মানুষের সামনে নিজের অহমিকার দেয়ালটুকু কিভাবে যেন গুড়িয়ে গিয়েছে। আর তখনই কেমন যেন হয়ে যায় গল্পগুলো। দুটো মানুষের পরিচয় মানেই একে অপরের জীবনে প্রভাব ফেলে দেওয়া। একজন আরেকজনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

একটি গল্প হয়তো খুব বেশিই শোনা যায়। ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসা চুল বেণী করা পড়ুয়া টাইপের মেয়েটাকে যখন পঞ্চম বেঞ্চে বসা উসকোখুসকো চুলের ছেলেটিকে ভাল লেগে যেত তখন সে প্রথমে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা চালাত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আনমনে চুলে সিঁথিটা পালটে অন্য দিকে নিয়ে দেখত তার রুক্ষ চেহারায় পরিবর্তন আসছে কিনা। পঞ্চম বেঞ্চের বন্ধুগুলোকে পাশ কাটিয়ে ছেলেটা আস্তে আস্তে তৃতীয় বেঞ্চে বসতে নিজেকে অভ্যস্ত করত। ওদিকে পড়ায় মনোযোগ নেই সেই ছেলেটিও ক্লাসে লেখাপড়ায় কিছুটা হলেও যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতো। যেদিন সিদ্ধান্ত নিত মেয়েটাকে প্রপোজ করবে তার এক সপ্তাহ আগ থেকে চলতে থাকত রিহার্সাল… শাওয়ারের নিচে, আয়নার সামনে কিংবা অন্ধকারে একা রাস্তায় । এখনের মতো মেসেঞ্জারে এত দ্রুত বলে ফেলা যেতো না। ভাবতে হতো। অপেক্ষা করতে হতো সঠিক ঐ মুহূর্তটির জন্য। আসবে ওই মুহূর্ত এবং লুফে নিতে হবে সঠিক শব্দের গুচ্ছ। হাতের পেছনে লজ্জাবনত ভুলের তোড়াও মাথা উঁচিয়ে তাকাতো যখন দুজনের সমঝোতা নিশ্চিত হতো। ভালোবাসার মানুষটির হাতের লেখার ওপর ঠোঁটের স্পর্শ করতেও যেন আত্ম-সমালোচনায় ভুগত তারা। আজ এসব গল্প ভাবতে গেলে কল্পনাশক্তির জোর লাগে।

সমাজ পাল্টেছে, জগত পাল্টেছে, রাজনীতি পালটেছে, মানুষগুলো পাল্টেছে আর পাল্টেছে ভালোবাসাও। আজও মানুষ প্রেমে পড়ে। ভালোবাসা তো শাশ্বত। তবে আজকাল মানুষের বেশিরভাগ সময় যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আইডির দিকে। তার আপলোড করা ছবির ভিত্তিতে আমরা বিচার করি। একবারও ভাবি না ওই ছবি আসলে কোনো অর্থ বহন করে না। অনেকগুলো ছবি তুলে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছবিটিই তুলে দেওয়া হয়। আমরা সেটাকেই ভাবি সত্যি। অথচ ঐ ছবিটিও নানা কৃত্রিম পদ্ধতিতে সুন্দর করার প্রচেষ্টা থাকে। আজকাল প্রেমে পড়ানোর জন্য নির্ভর করা হয় চ্যাটিং উইন্ডোতে, পড়াশুনো কিংবা কোন এক্সট্রা কারিকুলাম দিকে নয়। এজন্য সবার মধ্যেই কেমন হতাশার গল্প। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশাকে পুঁজি করে কত লেখা। যাকে উদ্দেশ্য করে লেখা সেও দেখছে। তবে সে উত্তর দেয় না। তার সে দায় নেই। আগের মতো হতাশা থেকে টেনে তোলার সেই শ্রদ্ধাবোধ প্রিয়জনের কাছে আশা করা ভুল। প্রযুক্তি থেকে আমরা যেমন রোজ অনেক কিছু পাচ্ছি, ঠিক তেমনে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলছি। অবশ হতে থাকছে আমাদের আবেগ- অনুভূতি, ভুলে যাচ্ছি ভালোবাসা প্রকাশ করার ভাষাটা।

আজ পোস্টম্যানকে মুক্তি দিয়ে আমরা তথ্য চুরি করে এমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। ভাবছি এটাই তো সহজ ও সাশ্রয়ী। বাড়ছে ভুল বোঝাবোঝি। আর বিচ্ছেদটাও সহজ। আমাদের নির্লিপ্ত চেহারা বাহ্যত থাকলেও ইমোজি দিয়ে মিথ্যে কিছু অনুভূতি প্রচার করা হচ্ছে। আবার ভেতরে ভেতরে এক ধরনের অভিমান সবারই থেকে যাচ্ছে। সে আমার অনুভূতি বোঝে না। সেটা মুখ ফুটে বলারও সাহস নেই এই গোপনীয়তায়। যাকে চেনাই হয় না এবং যার উপস্থিতির প্রভাবই জীবনে পড়েনি, তার কাছে এর বেশি কিছু আশা করাটা কি অন্যায় নয়?

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ /এমএম


Array