Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: সরকারি পর্যায় খাদ্যশস্যের মজুদ অস্বাভাবিকভাবে কমছে। চলতি বছর খাদ্যশস্য সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল তাও পূরণ হয়নি। এই সুযোগে সরকার ও ভোক্তাকে জিম্মি করে বাড়তি মুনাফা করতে আবার কারসাজি শুরু করেছে মিলাররা। এক মাসের ব্যবধানে প্রতিবস্তা চালে (৫০ কেজি) সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে তারা। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে। করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চালের এই বাড়তি দর নিয়ে অসন্তুষ্ট ভোক্তারা।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার গমসহ অন্যান্য খাদ্যশস্য আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাশিয়া থেকে গম আমদানির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১৫ মার্চ খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৭ লাখ ৫১ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৪ হাজার ২৯ লাখ টন এবং গম ৩ লাখ ২২ হাজার টন। জুলাই মাসে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ১৫ লাখ ১৪ হাজার টন। আগস্ট মাসে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার টন।

সেপ্টেম্বরে আরও কমে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৯২ হাজার টন। অক্টোবর মাসে সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ১০ লাখ ৮১ হাজার টন। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, ২২ নভেম্বর সরকারি গুদামে ৮ লাখ ৪০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে। এর মধ্যে চাল ৫ লাখ ৮৫ টন ও গম ২ লাখ ৫৫ টন।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে খাদ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এজন্য এখনই সচেতনতা জরুরি। তিনি বলেন, বর্তমানে খাদ্য মজুতের অবস্থা ভালো নয়।

এরপর এ বছর খাদ্য সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তাও পূরণ হয়নি। এ অবস্থায় যে কোনো মূল্যে মজুদ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে খাদ্য আমদানি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও আমদানি করতে হবে। তবে খাদ্য মজুদের চেয়ে বড় সমস্যা আমাদের বণ্টন ব্যবস্থায়। এক্ষেত্রে ভিজিডি এবং ভিজিএফ কার্ডের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

সোমবার নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চলে মিল পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বস্তা মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ২৭৮০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ২৬২৫ টাকা। পাশাপাশি বিআর-২৮ চাল প্রতি বস্তা মিল পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ২৪০০ টাকা; যা এক মাস আগে বিক্রি হয় ২২০০ টাকা। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, আগামী মৌসুমে বোরো ধানের আবাদ ৫০ হাজার হেক্টর বাড়ানো হবে। বন্যাসহ নানা কারণে এ বছর আমনের উৎপাদন ভালো না হওয়ায় ধানের দাম খুব বেশি। যেটি নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে আছি। সেজন্য যে কোনো মূল্যে আমাদের আগামী মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন বাড়াতে হবে। বোরোর চাষযোগ্য কোনো জমি যাতে খালি না থাকে সে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বোরোর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে মাঠ থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সব কর্মকর্তাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এবং কৃষকের পাশে থাকতে হবে। রাজধানীর সর্ববৃহৎ পাইকারি আড়ত বাদামতলী ও কারওয়ান বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার প্রতিবস্তা মিনিকেট চাল পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হয়েছে ২৮০০ টাকা, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ২৭০০ টাকা। বিআর-২৮ চাল প্রতিবস্তা বিক্রি হয়েছে ২৪৫০ টাকা, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা।

কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়ত আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক ও পাইকারি চাল বিক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রাহমান বলেন, মিল মালিকরা আবার চালের দাম বাড়াতে শুরু করেছে। এ বছর করোনার মধ্যে তারা বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়িয়েছে। সর্বশেষ এক মাসে প্রতি বস্তা চালে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছে। উপায় না পেয়ে আমাদের মতো পাইকারি বিক্রেতাদের বাড়তি দরেই চাল কিনতে হচ্ছে। যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়েছে।

রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এদিন প্রতিকেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হয় ৬০ টাকা। যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৮ টাকা। বিআর-২৮ চাল প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৫৩-৫৪ টাকা, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা। এছাড়া মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা চাল প্রতিকেজি বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকা, যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৪৭-৪৮ টাকা।

রাজধানীর মালিবাগ বাজারের খালেক রাইস এজেন্সির মালিক ও খুচরা চাল বিক্রেতা দিদার হোসেন বলেন, মিলাররা নানা অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়েছে। এখন আবার তারা দেখেছে আমনের ফলন ভালো হয়নি। যার কারণে তারা এই ইস্যুকে ভর করে আবারও কারসাজি শুরু করেছে। তারা এবার ধানের দাম বেশি বলে বস্তাপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করছে। কিন্তু বাজারে নতুন মৌসুমের চাল আসতে শুরু করেছে। তারপরও দাম কমছে না। যে কারণে পাইকারি বাজারে চালের দাম বেড়েছে। আর খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।

এই বাজারে চাল কিনতে আসা ইকবাল হাসান বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাজারে নিত্যপণ্যের যে দাম তাতে ভোক্তারা হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে নতুন করে আবারও চালের দাম বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকে, তাহলে বরাবরের মতো অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও মুনাফা জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। বাড়িয়ে দেবে নিত্যপণ্যের দাম।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ধান-চালের বাজারে কাউকে সিন্ডিকেট করতে দেয়া হবে না। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে বাজার দর ও মজুদের ওপর দৃষ্টি রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ করবে সরকার।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/২৪ নভেম্বের ২০২০/এমএম