Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::  করোনাভাইরাসে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা অটোপাস পাচ্ছে। কিন্তু প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পরের ক্লাসে কোন পদ্ধতিতে পদোন্নতি পাবে সে বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি আজও। অন্যদিকে উভয় স্তরের শিক্ষার্থীদের চলছে অনানুষ্ঠানিক লেখাপড়া।

তাদের মধ্যে শিখন ঘাটতি ঘোচাতে পরিকল্পনামাফিক মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের ওপর নেয়া হচ্ছে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’। কিন্তু প্রাথমিক স্তরের জন্য এ ধরনের বিশেষ কোনো কর্মসূচি এখনও ঘোষণা করা হয়নি। ফলে অনেকটা দিকনির্দেশনাহীনভাবেই চলছে এ স্তরের শিক্ষা।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের (ডিপিই) মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম রোববার বলেন, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া থেমে নেই। সংসদ টিভি এবং বেতারের কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে শিক্ষকদের গ্রুপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে যারা পারছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষার্থীর বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিচ্ছেন। বাকিরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাঠ প্রদানের পাশাপাশি গ্রহণ করছেন। এক্ষেত্রে অভিভাবকরা মাধ্যম হিসেবে কাজ করছেন। আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদেরকে লেখাপড়ায় যুক্ত (অ্যাঙ্গেজড) রাখা, পরীক্ষা নেয়া নয়। পদোন্নতির ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিগগিরই ঘোষণা দেয়া হবে।

করোনার কারণে ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তবে শর্তসাপেক্ষে কওমি মাদ্রাসাগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। আর কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরাসরি লেখাপড়া করানোর অনুমতি পায়নি। সেই হিসাবে ৯ মাস ধরে বন্ধ আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

বিদ্যমান বাস্তবতায় কেবল বছরের প্রথম আড়াই মাসের শ্রেণি কার্যক্রমই শিক্ষার্থীদের চলতি বছরের সরাসরি প্রাপ্ত পাঠ। এতে শিক্ষার্থীর বয়স ও শ্রেণি অনুযায়ী শিখন ও প্রশিক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

নীতি-নির্ধারকরা দাবি করছেন, সংসদ টিভি ও বেতারের মাধ্যমে পাঠদান চলছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের দাবি, ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাছে এই পাঠ পৌঁছাচ্ছে। যদিও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাচ্ছে টিভির পাঠ।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকর্ষণহীনতার কাছে যাদের কাছে টিভি-রেডিওর পাঠ পৌঁছেছে তারাও অনেকেই এখন তা দেখছে না। তবে এর বিকল্প হিসেবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরা বাড়িতে গিয়ে বা মোবাইলে শিক্ষার্থীর পাঠ গ্রহণ করছেন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, যদিও বিকল্প মাধ্যমে শিশুদের লেখাপড়া চলছে কিন্তু আনুষ্ঠানিক পাঠদানের অভাবে শিখনের একটা গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে। শহরাঞ্চলে এর প্রভাবটা কম পড়বে।

কিন্তু মূল প্রভাবটা পড়বে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ওপর। এজন্য মাধ্যমিক স্তরে যে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ পদ্ধতি শুরু হয়েছে সেটা অনেকটা কাজে লাগবে। তবে এ ক্ষেত্রে তিনটি চ্যালেঞ্জ আছে।

এগুলো হচ্ছে, সবার কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা; যারা (গ্রামাঞ্চলের) পিছিয়ে গেছে তাদের ব্যাপারে আন্তরিকভাবে কাজ করা; যাদের বাড়িতে লেখাপড়া জানা বাবা-মা-ভাইবোন নেই তাদের অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করা।

প্রথম দুটি প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয় হলেও শেষেরটির জন্য প্রশাসনিক নির্দেশনার পাশাপাশি শিক্ষককে আন্তরিক হতে হবে। অ্যাসাইনমেন্ট দিতে গিয়ে বা পরে মোবাইল ফোনে পাঠ বুঝিয়ে দিলে এসব শিক্ষার্থীর জন্য তা উপকার হবে। বিদ্যমান ঘাটতি পূরণে শিক্ষকরাই শেষ ভরসা।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তর এখন পর্যন্ত দিকনির্দেশনাহীন আছে। তাদের জন্যও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় চিন্তা করতে পারে। যদি দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা না যায় তাহলে ঝরে পড়া, শিশুশ্রম বাল্যবিবাহ, শিক্ষকশ্রম ইত্যাদি ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে।

দেশের শিক্ষাক্রম নিয়ে কাজ করে থাকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। সংস্থাটির সদস্য (প্রাথমিক) অধ্যাপক রিয়াজুল হাসান বলেন, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদেরকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করে শিখন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেয়ার চিন্তা করেছি। প্রথমটি হচ্ছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই স্তরে শিক্ষার্থীরা যুক্ত বর্ণ এবং লেখা ও পড়ার দক্ষতার অর্জন করে থাকে।

আনুষ্ঠানিক শ্রেণির কাজ না হওয়ায় বিষয়টিতে ঘাটতি থাকতে পারে। এটা পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় ভাগে আছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। এদের যে ঘাটতি থাকবে সেটা পূরণ করা বেশি কষ্টকর হবে না।

এই দুই ভাগের জন্য আমরা ‘রিমেডিয়াল প্যাকেজ’ করব। যেহেতু ক্লাস খুলছে না তাই যে পরিকল্পনা তৈরি করা হবে সেটা পরের ক্লাসে দেয়ার চিন্তা আছে। তিনি বলেন, তৃতীয় ভাগে আছে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা তূলনামূলক বড়। এজন্য তাদেরকে মাধ্যমিক স্তরের মতো অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া যায় কি না সেই ভাবনা চলছে। দু’একদিনের মধ্যে এ নিয়ে কাজ শুরু করা হবে।

ডিপিই মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বলেন, স্কুল খোলার সম্ভাবনার নিরিখে শিক্ষার্থীদের জন্য এর আগে ৪০ দিনের একটি প্যাকেজ করেছিলাম। সেটি এনসিটিবিতে পাঠানো হয়েছে।

এই মুহূর্তে এ বছরে মূল্যায়নের চেয়েও ‘শিখন ঘাটতি’ চিহ্নিত করে আগামী বছরের পাঠের আগে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা জরুরি। সেটা নিয়ে আমরা এখনই কাজ করব যাতে জানুয়ারিতে নতুন বই বিতরণের সঙ্গে শিক্ষকদের কাছেও তা হস্তান্তর করা যায়।

এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান বলেন, শিক্ষার্থীর বয়স এবং শ্রেণি অনুযায়ী শেখা ও দক্ষতা অর্জনের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড আছে। আনুষ্ঠানিক লেখাপড়া না হওয়ায় সেখানে ঘাটতি থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা সেই ঘাটতি চিহ্নিত করে শিক্ষকের কাছে পৌঁছে দেব। এই ঘাটতি অনুযায়ী বাড়তি পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। দু’একদিনের মধ্যে এই কাজ শুরু হবে। এটি করতে দুই সপ্তাহ লাগবে।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৬  নভেম্বের ২০২০/এমএম