আহসান রাজীব বুলবুল, প্রধান সম্পাদক, প্রবাস বাংলা ভয়েস :: কানাডায় ২১ বছর — “অনেক কথায় মুখর আমি”
প্রবাসজীবনের ২১ বছর পূর্ণ হলো।
সময় কত দ্রুত চলে যায়! অথচ কিছু দিন, কিছু মুহূর্ত, কিছু বিদায়ের দৃশ্য আজও হৃদয়ের গভীরে একই রকম জীবন্ত হয়ে আছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর— শুধু একটি বিমানবন্দর নয়; এটি শত শত প্রবাসী সন্তানের বিদায়, বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত চোখ, বুকভরা কষ্ট আর না-বলা ভালোবাসার এক নীরব সাক্ষী।
মনে পড়ে সেই দিনটির কথা। সেদিন প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে অজানা এক ভবিষ্যতের পথে পাড়ি দিয়েছিলাম। স্বপ্ন ছিল, নতুন জীবনের হাতছানি ছিল; কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যে কত বিচ্ছেদ, কত না-পাওয়া, কত শূন্যতা অপেক্ষা করছিল—তা তখনো বুঝিনি।
এই দীর্ঘ ২১ বছরের পথচলায় হারিয়েছি অনেক আপনজন। সবচেয়ে বড় শূন্যতা—বাবা-মাকে হারানো।
আজ দূর প্রবাসে, পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে যখন অতীতের পাতাগুলো উল্টাই, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজারো স্মৃতি। মনে পড়ে শৈশব, মনে পড়ে মায়ের আঁচল, বাবার ছায়া, তাঁদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
শুধু পাশে নেই তাঁরা।
প্রবাসের প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ের গভীর থাকে একটাই প্রার্থনা—পৃথিবীর সকল বাবা-মা ওপারে ভালো থাকুন, শান্তিতে থাকুন।
কানাডায় চলে আসার পর মা আমার কত রাত যে নিরবে কেঁদেছেন, কতবার যে আমার ফাঁকা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন—তা আমি জানতাম না।
আমার বিছানায় শুয়ে সন্তানের শরীরের ঘ্রাণ খুঁজেছেন। পুরোনো জামা বুকে জড়িয়ে হয়তো অনুভব করতে চেয়েছেন তাঁর দূরে থাকা সন্তানকে। কখনো একা পথে হেঁটেছেন—হয়তো মনে হয়েছে, যদি হঠাৎ করেই তাঁর আদরের সন্তানকে দেখতে পান!
অথচ মা এসব কষ্টের কথা কোনোদিন আমাকে জানতে দেননি। সব জেনেছি তাঁর চলে যাওয়ার পর।
সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের যে অদৃশ্য ত্যাগ, যে নিঃশব্দ কান্না—সন্তান অনেক সময় তা বুঝতে পারে না। বাবা-মা নিজের কষ্টকে লুকিয়ে রাখেন শুধু সন্তানের হাসিমুখ দেখার জন্য।
এই পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তি, কোনো বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত বাবা-মায়ের ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি। আর কোনোদিন পারবেও না।
প্রবাসজীবনের এই ২১ বছরের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—বাবা-মায়ের শেষ সময়ে তাঁদের পাশে থাকতে না পারা। শেষবারের মতো হাত ধরে বলতে না পারা, “আমি আছি”। নিজের হাতে তাঁদের শেষ বিদায়ের মাটি দিতে না পারা।
আমার মতো অসংখ্য প্রবাসী সন্তানের বুকেই হয়তো এমন কিছু অপূর্ণ কষ্ট সারাজীবন বেঁচে থাকবে।
প্রবাস আমাদের স্বপ্ন পূরণ করে, কিন্তু কখনো কখনো আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় সবচেয়ে মূল্যবান কিছু মুহূর্ত।
আজ ২১ বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয়—
স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা কত কিছু পেছনে ফেলে আসি!
“দু’দিন প্রবাসে আসি, বৃথাই বাঁধিনু ঘর…”
— অনেক কথায় আজ মুখর আমি।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/কানাডা/০৩ আগস্ট ২০২৬/এএ





