প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ মৌলিক গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। সিনিয়র শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এই গবেষণা। এ ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে তহবিলের সংস্থান হয়। উন্নত বিশ্বে এই রেওয়াজ চালু আছে।কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশা অনুয়ায়ী গড়ে ওঠেনি এমন সংস্কৃতি। বরং বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা হয় নামমাত্র। কেউ পদোন্নতির জন্য গবেষণার নামে প্রবন্ধ লেখেন। আবার কেউ নামের আগে ‘ডক্টর’ লাগাতে থিসিস লেখেন। তবে এই হারও দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিপরীত দিকে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে চাকরির বাজারে ‘গ্র্যাজুয়েট সরবরাহ’র প্রতিষ্ঠানে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা পরিস্থিতির ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন খোদ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি বলেছেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো একেকটি গবেষণাগার। মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে মানসম্পন্ন গবেষণা ও গবেষণালব্ধ কাজের প্রয়োগ অতি গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবনযাত্রা গতিশীল হলেও দুঃখের বিষয় হলো, গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে। এক সময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হতো। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই যেন সেই ঐতিহ্য সংকুচিত হয়ে আসছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। এ লক্ষ্যে দুটি নীতিমালা করা হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দুই ভাগ করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা। অন্যটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বাজেটের ২ শতাংশ ব্যয়ের নির্দেশ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও গবেষণার উদ্বেগজনক চিত্র বেরিয়ে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, দেশে অর্ধেকের বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম নেই। দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের পিএইচডি ডিগ্রি নেই।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বছর ধরে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক বাড়ছে। বিপরীত দিকে একই সময়ে এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার হার কমেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন যথাক্রমে ৪১৬০, ৪৪৩২ এবং ৪৫২৮ জন আর সহযোগী অধ্যাপক ২৩২০, ২৫৪১ ও ২৬৫৭ জন।
সাধারণত উচ্চতর গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ও তত্ত্বাবধান করেন এই অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকরা। সেই হিসাবে এমফিল-পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার হার বাড়ার কথা, কিন্তু কমেছে। গবেষক ভর্তি করার হিসাবে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের হার ওই তিন বছরে যথাক্রমে ৮০, ৭৭ ও ৬৮ শতাংশ। ২০২০ সালে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৪৬টি।
অন্যদিকে অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণা করার মতো সিনিয়র শিক্ষকের ঘাটতি আছে। এসব প্রতিষ্ঠান এমফিল-পিএইচডি গবেষণা করানোর অনুমতি পায়নি। ২০২০ সালে এ ধরনের ৯৮টি প্রতিষ্ঠান ছিল। সর্বমোট শিক্ষক ছিলেন ১৫ হাজার ২৭৭ জন। তাদের মধ্যে পূর্ণকালীন অধ্যাপক মাত্র ১৬৯৪ জন, যা শতকরা হারে ১১ শতাংশ।
আগের বছরের চেয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কমেছে। ওই বছর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ছিলেন ৩২০৯ জন, যাদের মধ্যে পূর্ণকালীন ছিলেন ১৬১০ জন। অবশিষ্ট অধ্যাপকরা ছিলেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাড়া করা।
ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর লেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা না হওয়ার বহুমাত্রিক কারণ আছে। যেমন : অনেকের মধ্যেই অধ্যাপক হওয়া বা পদোন্নতির জন্য কিছু গবেষণা করার তাগিদ দেখা যায়। সেটাও বেশিরভাগ ‘গবেষণা-প্রবন্ধ’নির্ভর। উন্নত বিশ্বে সরকারিভাবেই গবেষণা খাতে মোটা অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়। বাংলাদেশে নিয়মিত বরাদ্দ হয়, তবে তা বড় ধরনের গবেষণা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় বেসরকারি শিল্প খাত থেকে বড় বড় সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় যায় তারা। সংশ্লিষ্ট অধ্যাপককে সেই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল দেওয়া হয়। এছাড়া পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি নেই।
সাধারণত সরকারিভাবে উচ্চতর গবেষণার জন্য কমবেশি বরাদ্দ আছে। প্রতিবছর সরকার ইউজিসির মাধ্যমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তহবিল দেয়। কিন্তু ওই অর্থের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা আর শিক্ষক ও অন্যান্য জনবলের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হয়ে যায়। দেখা গেছে, বর্তমানে জাতীয় বাজেট থেকে শিক্ষায় যে বরাদ্দ আছে, উচ্চশিক্ষায় সেখান থেকে বরাদ্দ এক শতাংশেরও কম, মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ।
৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এবার ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে গবেষণা খাতে ১৫০ কোটি টাকা। তবে এই টাকাও সব বিশ্ববিদ্যালয় পায়নি। একটি অংশ রেখে দিয়েছে ইউজিসি। ওই টাকা থেকে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আলাদাভাবে গবেষণা, গবেষণা সংক্রান্ত কাজে দেশের ভেতরে ও বাইরে সফরসহ আনুষঙ্গিক কাজে বিনিয়োগ করে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন সরকারি সংস্থারও গবেষণা খাতে বরাদ্দ আছে। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আলমগীর বলেন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, পিডিবি, টেলিযোগাযোগ এমনকি স্বাস্থ্যসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের এই খাতে বরাদ্দ আছে। কিন্তু এই টাকা ব্যয়ের রেকর্ড খুব কম। অথচ অন্যান্য দেশে এসব খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকদের অর্থায়নের রীতি আছে। ওই অর্থে নেওয়া প্রকল্পে পোস্ট ডক্টরাল আবার কোথাও ডক্টরাল গবেষক নিয়োগের রীতি আছে। এতে একদিকে জনজীবনের সমস্যা সমাধানের পথ বের হয়। আরেকদিকে কিছু গবেষকও তৈরি হয়।
ইউজিসির আরেক সদস্য বলেন, বিশ্বে এই মুহূর্তে সবচেয়ে দামি গবেষণা বৃত্তিটা বাংলাদেশে। এর নাম হচ্ছে বঙ্গবন্ধু ওভারসিজ স্কলারশিপ। এক একজনকে প্রায় ২ কোটি টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। কিন্তু এই অর্থে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিদেশে গিয়ে গবেষণা করেন। এতে যেমন বিদেশে টাকা চলে যাচ্ছে, তেমনি দেশের নিজস্ব সমস্যা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে না। বরং টাকা দেশে রাখার ব্যবস্থা করা উচিত।
ওই সংস্থার সাবেক এক চেয়ারম্যান বলেন, গবেষণা শব্দটির সঙ্গে শিক্ষা, শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয় জড়িত। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বড় অঙ্কের ব্যয় আছে যা দিয়ে কর্মকর্তাদের বিদেশে পড়ালেখা করতে পাঠানো হয়। সেখানে শিক্ষকদের হিস্যা খুবই কম। ইদানীং নামের আগে ‘ডক্টর’ লেখার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। এই অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় করার সময় এসেছে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবর্ষের মধ্যে প্রথম গবেষণা মেলা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গবেষণায় বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্যোগও আছে।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ১৬ ডিসেম্বর ২০২২ /এমএম





