বাংলানিউজসিএ ডেস্ক :: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস একের পর এক জীবন কেড়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ২১ লাখের বেশি মানুষ। বাংলাদেশে করোনায় প্রাণ গেছে ৬০ জনের। আর আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। তাদেরই একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শেখ সাইফ। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে তিনি এখন করোনাভাইরাস নেগেটিভ। অর্থাৎ তিনি সেড়ে উঠেছেন। কিন্তু কীভাবে?
সেকথা তিনি সম্প্রতি শেয়ার করেছেন গণমাধ্যমে।
শেখ সাইফ জানান, গত ৮ এপ্রিল থেকে আমার কোভিড-১৯ ‘পজিটিভ’ আসে। ৬-৭ দিনের মধ্যেই আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়ায় কোভিড-১৯ নেগেটিভ করতে পেরেছি। অনেক ভাই, বোন, বন্ধুবান্ধব আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। আপনাদের দোয়া আর ভালোবাসায় আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ।
অসুস্থতার এই সময়টাতে বাসায় থেকে যতটুকু পেরেছি আমার প্রিয় মাতৃভূমির অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি। চেষ্টা করে যাচ্ছি কিছু করার।
করোনা পজেটিভ আসার ছয় দিনের মধ্যে আল্লাহর রহমতে নেগেটিভ করে ফেলার পেছনে কী কী করেছিলাম। সে কথায় এখানে বলছি। আশা করছি উপকৃত হবেন। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।
যেভাবে আমি সুস্থ হলাম
সাইফ জানান, আমার করোনাভাইরাস পজেটিভ এসেছিল। সেই পজেটিভ থেকে আজকে রেজাল্ট আসে নেগেটিভ। পজেটিভ হওয়ার পর থেকে গত ৬-৭ দিন বাসায় ছিলাম। আজকে আল্লাহ্র রহমতে নেগেটিভ এসেছে। আমি আসলে এই জায়গাটা থেকে আমার অভিজ্ঞতা জানাতে চাইছি। পজেটিভ থেকে নেগেটিভে নিয়ে আসতে হলে আসলে আমাদের কী করণীয়। বা আমার ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো কাজ করেছে?
আপনারা জানেন ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাস বাংলাদেশে ব্যাপকহারে বিস্তার লাভ করছে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজ নিজ জায়গা থেকে এলাকায় জনকল্যাণমূলক কাজ করছে। সেবামূলক কাজ করছে। ত্রাণ বিতরণ করছে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অবস্থা করেছি। বিগত কয়েকদিনে বেশ কয়েক জায়গায় ত্রাণ বিতরণ করেছি। টিএসসিতে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। নিজের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করেছি।
তাছাড়া আপনারা জানেন, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তিন-চার শয়ের মতো অবলা কুকুর বিড়াল রয়েছে। এইসব অবলা প্রাণীদের গত মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে খাওয়ানোর কাজটা আমি করে আসছিলাম কয়েকজন ভলেন্টিয়ারসহ। এই কুকুর বিড়ালগুলোকে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখাশোনা করা। তারপর ত্রাণ বিতরণ করা। হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ অন্যান্য জিনিস বিতরণ কাজে নিযুক্ত ছিলাম।
সাইফ আরও বলেন, এই কাজের জন্য অধিকাংশ সময় আমার ঘরের বাইরে থাকতে হয়েছে। যে সময়ে আসলে আমার ঘরে থাকা উচিত ছিল।
আমার বাবা মা দেশের বাড়ি থেকে প্রতিদিন ফোন দিতেন বাসায় যাবার জন্য। একটা পর্যায় সিদ্ধান্ত নিলাম বাসায় যাব। কিন্তু মনে হলো আমি টেস্ট করে তারপর যাব। টেস্ট করা ছাড়া ঢাকা থেকে আমি আমার এলাকায় যাব। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে টেস্ট না করে যাওয়া উচিত হবে না।
সেই দায়বদ্ধতা থেকে টেস্ট করাতে গেলাম। অপ্রত্যাশিতভাবে আমার করোনাভাইরাস পজেটিভ চলে আসে। রাত ১২টার দিকে আইইডিসিআর থেকে ফোন দিয়ে আমাকে বলে আপনার করোনাভাইরাস পজেটিভ। পজেটিভ আসার পরে আমি সাথে সাথে যেটি করেছি সেটি হচ্ছে- আমার সাথে বিগত কয়েকদিন যারা ছিল তাদেরকে ফোন দিয়ে, ম্যাসেজ দিয়ে বিষয়টা জানিয়ে দিই। তাদের বলেছি সন্দেহ হলে আপনারা টেস্ট করাতে পারেন অথবা কোয়ারেন্টিনটা মানার চেষ্টা করেন। কারণ আমার জন্য কেউ আক্রান্ত হোক এটা আমি কখনই চাই না। আমার বিবেকবোধ থেকেও আমি সেটা করব না। আসা করি আপনারাও সেটা করবেন না।
সাইফ জানান, আমার পজেটিভ আসে গত ৮ এপ্রিল। তারপর ১৪ এপ্রিল আবার স্যাম্পল দিয়ে আসি। আজ ১৫ এপ্রিল দুপুর বেলা আমাকে জানানো হয় করোনাভাইরাস নেগেটিভ।
তো পজেটিভ থেকে নেগেটিভে আসলো কীভাবে সেটিই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই। আমি কী কী করেছি সেই অভিজ্ঞতা জানাতে চাই এই কারণে যে , অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃত্যুবরণ করছেন। যারা মৃত্যুবরণ করছেন তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ্ না করুক।
যদি কেউ আক্রান্ত হয়ে যান, সেক্ষেত্রে কী করবেন? বা আমি কী করেছি-
প্রথমে আমি নিজেকে একটি ঘরে একা আবদ্ধ করে ফেলি। আমার আশেপাশে কাউকে আসতে দিইনি। একেবারেই একা ছিলাম।
এরপর আমি প্রতিদিন যখন গোসল করতাম তখন পানি গরম করে নিতাম। সেই পানিতে স্যাভলন মিশিয়ে গোসল করেছি।
স্বাভাবিকভাবেই স্যাভলন পানি দিয়ে গোসল করা ভালো। এই সময়টাতে অবশ্যই গরম পানিতে স্যাভলন মিশিয়ে গোসল করবেন। এটি জীবাণুনাশের জন্য অনেক ভালো কাজে দেবে।
এরপর আমি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়াম করতাম। তার পরপরই গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করতাম। গরম পানি যতটুকু গলায় সহ্য করা যায়। সেই পরিমাণ গরম পানি সাথে লবণ দিয়ে গড়গড়া করতাম। প্রতিদিন দুপুরে এবং ঘুমানোর আগে করতাম। প্রতিদিন এটি তিনবার করতাম।
আর একটি ব্যাপার যেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে মনে হয়েছে। বেশি কাজে দিয়েছে আমার মনে হয়। প্রতি এক ঘণ্টা পরপর গরম পানি খাওয়া। যতটা গরম আপনি সহ্য করতে পারেন। আমি এক ঘণ্টা পরপর এক-দুই গ্লাস করে গরম পানি খেতাম। আমার মনে হয় এটি খুব বেশি কাজে দিয়েছে আমার ভাইরাস দূর করার জন্য।
আর যেগুলো আমরা জানি- এক ঘণ্টা পরপর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে। যেটি আমি সব সময় করেছি। সব সময় সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতাম। আমার কাপড়-চোপড়গুলো পরিষ্কার করে রাখতাম। রুমটা খুব ভালোভাবে স্যাভলন পানি দিয়ে প্রতিদিন পরিষ্কার করেছি।
আর খাবারের ক্ষেত্রে সব রকম খাবার খাওয়া যাবে। যেটা আইইডিসিআর থেকে আমাকে বলেছে। খাবার নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। যেকোনো খাবার খেতে পারেন। তবে ভিটামিন সি টা বেশি রাখা ভালো। আমি ট্যাবলেট কেভিট –সি টা খেয়েছি। ১০ ট্যাবলেট থাকে। আমি ৬টা খেয়েছি মাত্র। আর খাওয়া লাগেনি।
এছাড়া কমলালেবু, লেবুর শরবত, আপেল, মালটা, নাশপাতি। যেগুলো আমি খেয়েছি। এগুলো সবাই যে খেতে পারবে তা কিন্তু নয়। অনেক দরিদ্র লোকজনের পক্ষে সম্ভব নয়।
তো এক্ষেত্রে কোনো গরিব মানুষ যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের। তারা যদি কেউ আক্রান্ত হন তাহলে তাদের বলব, আপনারা প্রতি এক ঘণ্টা পরপর সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবেন। গরম পানি খাবেন। তিনবেলা গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করবেন। যদি কারো কোনো কারণে পজেটিভ চলে আসে ভয়ের কোনো কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ্ নেগেটিভ চলে আসবে।
সাইফ বলেন, এটা ছিল আমার অভিজ্ঞতা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। কারো ভাইরাস পজেটিভ হয়ে গেলেও ভয়ের কোনো কারণ নেই। একেবারেই ভেঙে পড়ার কোনো কারণ নেই। শুধু সচেতন থাকুন। নিজেকে একটি রুমে আবদ্ধ করে ফেলুন। আর সবকিছু মেনে চলুন। পজেটিভ হলেও পরে নেগেটিভ চলে আসবে আল্লহর রহমতে। আমার যেমন ৫ -৬ দিন সময় লেগেছে । আপনাদেরও এমনই সময়ের ভেতরই ভালো হয়ে যাবে।
আর সবশেষে আপনাদের কাছে করজোড়ে অনুরোধ করি। দয়া করে এই সময়টাতে ঘরে থাকুন। নিজে বাঁচুন, আপনার পরিবারকে বাঁচান। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে বাঁচান।
বাংলানিউজসিএ/ঢাকা/ ১৭ এপ্রিল ২০২০/এমএম





