Menu

প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক ::‌ নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি, জীবন মানের নিম্নগতি আর অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক সংকট—এই ছিল আর্জেন্টিনার বাস্তবিক চিত্র। এক শতাব্দী পূর্বেও বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের কাতারে যার নাম ছিল সেই আর্জেন্টিনার এমন শোচনীয় অবস্থা আর রাজনৈতিক সংকটের মুখে দানা বাঁধতে যাওয়া জনবিক্ষোভ এক নিমিষেই ম্লান হয়ে গেছে মেসিদের বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে। জনবিক্ষোভ রুপ নিয়েছে উৎসবে।

দেশের মানুষের অবস্থা ভাল ছিল না। এমন সময়ে আমাদের একটি আনন্দ প্রয়োজন ছিল। মেসি এবং তার বাহিনী বিশ্বকাপ জিতেছে। এটি আমাদের যে আনন্দ দিয়েছে এই মূহুর্তে জনগণের জন্য সেটার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। গতকাল (রবিবার) আমি অনেক সুখী মানুষ দেখেছি, যেমন আগে কখনো দেখা যায়নি। সর্বস্তরের মানুষকে খুশি দেখেছি। দেখলাম ঐক্যবদ্ধ মানুষ। কোনো বিভেদ ছিল না, আমরা সবাই ভাই-ভাই।

পলিটিকোর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনা গত কয়েক দশকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তা আরও ভয়াবহ রুপ নিয়েছে। চলতি বছর দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। উবে গেছে মধ্যবিত্তদের সঞ্চয় এবং মুছে গেছে তাদের স্বপ্ন। যারা তাদের সম্পদ ইউরো বা ডলারে আংশিক বৈধ কালো বাজারে বিনিয়োগ করতে পারে তারা বৈধ বাজারের চেয়ে বেশি বিনিময় হার পেয়ে থাকে।

আর্জেন্টিনার ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি আলবার্তো ফার্নান্দেজের বামপন্থী সরকার দেশের প্রধান পণ্য সয়া, মাংস এবং গমের মতো কৃষি পণ্যের রপ্তানি সীমাবদ্ধ বা কর আরোপ করে মুদ্রা এবং অর্থনীতি উভয়কেই স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এই সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপের কারণে অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ফুটবলের জন্য বিখ্যাত ল্যাতিন আমেরিকার এই দেশটিতে ম্যারাদোনা-মেসিদের মতো ফুটবলারের পাশাপাশি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদও রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের অস্থিরতা দেশটির অবস্থা এতটাই শোচনীয় করেছে রাজধানী বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় এবং অন্যত্র গৃহহীন লোকের সংখ্যা ক্রমশই বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া যারা ময়লা কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো তাদের সংখ্যাও ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নজিরবিহীন সব সংকটের মধ্যে এক পশলা সুখের বৃষ্টি হয়ে দেখা দিয়েছে ৩৬ বছর বাদে জেতা একটি বিশ্বকাপ ট্রফি। মেসি বাহিনীর এমন বিজয়ে জাত, বর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ভুলে সকলে মেতেছে উৎসবে। ভুলে গিয়েছে সব দুঃখ, দুর্দশা আর হতাশা।

কাতার বিশ্বকাপ জয়ের পর আলবেসেলেস্তের মাস্টারমাইন্ড এবং কোচ লিওনেল স্কালোনি জাতীয় টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা মার খেতে অভ্যস্ত, সে কারণেই আমরা জানি কীভাবে ভাল এবং খারাপ সময় মোকাবেলা করতে হয়। শীর্ষে থাকা একটি অনন্য জিনিস, একটি অবিশ্বাস্য উপভোগ।’

তবে আপনি ধারণা করতেই পারেন, যে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ বর্তমানে দরিদ্রসীমার নিচে বাস করছে তাদের পাহাড় সমান অভাব একটা মাত্র ট্রফি কিভাবে ঘুচাবে? তার মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তো আছেই। এরকম ভাবনা নিতান্তই অমূলক নয়। কিন্তু আর্জেন্টাইনরা এই বিজয়কে কীভাবে দেখছে? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা বলেছি একজন আর্জেন্টাইনের সঙ্গে। রাজধানী বুয়েনস আইরেস থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরের শহর হোসে সি পাজের বাসিন্দা লরেনা রোমেরো জানিয়েছেন তার শহরের বর্তমান পরিস্থিতি।

লরেনা বলেন, ‘এদেশে ভালোভাবে বাঁচতে হলে আপনাকে একজন যোদ্ধা ও বুদ্ধিমান হতে হবে। আপনি যদি কিছুই না নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন তবে আপনাকে আরও অভাবে থাকতে হবে। কারণ জীবনে ভাল অবস্থানে নিজেকে দেখতে চাইলে আপনাকে অনেক ব্যয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু এখানে টিকে থাকা অসম্ভব নয়। আপনার পেশা ভাল হলে আপনার উপার্জন বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আপনি যদি একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হন তবে আপনার মাসিক উপার্জন ভাল থাকবে। আমার একজন বন্ধু আছে যে ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সে মাসে ৯০ হাজার পেসো উপার্জন করে এবং বেচে থাকার জন্য এটা যথেষ্ট।’

লরেনা আরও বলেন, কিন্তু অনেক লোক রয়েছে যারা রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিতে বাস করে। তাদের ভর্তুকি দেওয়া সরকারের সামাজিক পরিকল্পনার অংশ। রাষ্ট্র তাদের প্রায় ২৫ হাজার আর্জেন্টাইন পেসোর মতো অর্থ প্রদান করে। কিন্তু এটি খুব সামান্য, বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। সমস্যা হলো আর্জেন্টিনায় একের পর এক সংকট লেগেই আছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে একটি ভয়ানক সংকট ছিল। সেই ধাক্কা অনেকেই সামলে উঠতে পারেনি।’

দীর্ঘদিন পর তীব্র সংকটের মধ্যে এবার ফুটবল বিশ্বকাপ জিতেছে আর্জেন্টিনা। এই জয় বর্তমান পরিস্থিতিতে কেমন প্রভাব রেখেছে তার জবাবে লরেনা বলেন, ‘আমি মনে করি এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের এত বেশি প্রয়োজন ছিল তার একটি কারণ হলো আমাদের বর্তমান সংকট। দেশের মানুষের অবস্থা ভাল ছিল না। এমন সময়ে আমাদের একটি আনন্দ প্রয়োজন ছিল। মেসি এবং তার বাহিনী বিশ্বকাপ জিতেছে। এটি আমাদের যে আনন্দ দিয়েছে এই মূহুর্তে জনগণের জন্য সেটার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। গতকাল (রবিবার) আমি অনেক সুখী মানুষ দেখেছি, যেমন আগে কখনো দেখা যায়নি। সর্বস্তরের মানুষকে খুশি দেখেছি। দেখলাম ঐক্যবদ্ধ মানুষ। কোনো বিভেদ ছিল না, আমরা সবাই ভাই-ভাই।’

বহু বছর ধরে অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং ব্যাপক দুর্নীতির ঘটনা সত্ত্বেও, দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি গ্যাসের মতো জীবাশ্ম সম্পদের জন্য সমৃদ্ধ। বিশেষ করে দেশটির পাতাগোনিয়ায় অবস্থিত ‘মৃত গরু’ ক্ষেত্রটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেল গ্যাস রিজার্ভ। এছাড়াও দেশটিতে লিথিয়ামের ভাল মজুদ রয়েছে যা বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ইলেকট্রনিক্সের ব্যাটারির একটি মূল উপাদান। জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের মতো পশ্চিমা নেতারা ইতিমধ্যেই সেই সম্পদগুলিকে কাজে লাগাতে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন৷

এমনকি আগামী বছর ইইউ এবং মার্কোসুর ব্লকের মধ্যে দীর্ঘ বিলম্বিত বাণিজ্য চুক্তির অনুমোদনও হতে পারে যা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ে সমন্বিত চুক্তি। ব্রাজিলের বর্তমান রাষ্ট্রপতি লুলা দা সিলভা এই চুক্তির জন্য আরও উন্নত মানের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কারণে বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

অপরদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্জেন্টিনার জাতীয় রাজনৈতিক পর্যায়েও আসতে পারে পরিবর্তন। কারণ দেশটিতে আগামী বছরের অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে যেখানে বামপন্থী সরকার সেন্ট্রাল-লেফট ব্লক এবং একটি নতুন উদারপন্থী দলের প্রার্থীদের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে৷ কারণ তারা সকলেই মার্কেট ফ্রেন্ডলি।

১৯৮৬ সালে সামরিক একনায়কতন্ত্র পতনের তিন বছর পর আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তী দিয়াগো ম্যারাদোনার হাত ধরে এসেছিল দেশটির ফুটবলের দ্বিতীয় শিরোপা। তারপর কেটে গেছে তিন দশকের বেশি সময়। ২০১৪ সালে ফাইনালে গিয়েও মেসিদের ফিরতে হয়েছে রিক্ত হস্তে। তবে এবার আর তিনি হতাশ করেননি। দেশকে ফুটবলের তৃতীয় শিরোপা এনে দিয়েছেন তিনি।এই শিরোপা আর্জেন্টিনার চলমান রাজনৈতি এবং অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে অনেকটাই সাহায্য করবে এমন স্বপ্নই দেখছেন আর্জেন্টাইনরা।

প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ২০ ডিসেম্বর ২০২২ /এমএম


Array