প্রবাস বাংলা ভয়েস ডেস্ক :: ভারতের অর্থনীতি চলতি অর্থ বছরে রেকর্ড পরিমাণ সঙ্কুচিত হয়েছে – দেশটির সরকার এই তথ্য প্রকাশের পর গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় লকডাউন শুরুর পর তিন মাসে জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদন সঙ্কুচিত হয়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
উৎপাদন, নির্মাণ, হোটেল, পরিবহন, আবাসনসহ অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সঙ্কোচন দেখা গেছে। এপ্রিল থেকে জুন — এই তিন মাসের জিডিপির সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে কৃষি ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রেই সঙ্কোচন হয়েছে অর্থনীতির।
লকডাউনের কারণ দেশটির অর্থনীতি প্রায় স্তব্ধ হয়ে থেকেছে করোনা মহামারির সময়কালে- শুধু খাদ্যপণ্য এবং ওষুধ উৎপাদন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া ওই সময়কালে সব কিছুই বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেজন্য একমাত্র কৃষি ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩.৪ শতাংশ।
কিন্তু শুধুই কি লকডাউনের জন্য অর্থনীতির এই রেকর্ড সঙ্কোচন? অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিত বসু বলেন, লকডাউনের আগে থেকেই ক্রমাগত সঙ্কুচিত হচ্ছিল ভারতের অর্থনীতি, লকডাউন শুধু ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গত দুবছর ধরে প্রতিটা ত্রৈমাসিকেই ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমেছে। বিনিয়োগ যেমন কমেছে, তেমনই কমেছে রপ্তানি। অর্থনীতির মূল অভিমুখটাই ছিল অনেকদিন ধরেই নিম্নগামী। তার ওপর এই লকডাউন হয়েছে – পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে কড়া লকডাউন। তার প্রভাব কোভিড সংক্রমিতর সংখ্যায় খুব একটা দেখিনি – কিন্তু অর্থনীতির একেবারে যাকে বলে বারোটা বেজে গেছে’।
প্রায় ২৪ শতাংশ সঙ্কোচনের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তাও অসম্পূর্ণ বলে সরকার নিজেই জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর অর্থ হল সঙ্কোচনটা আরও বেশি হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ অসংগঠিত ক্ষেত্রের সম্পূর্ণ হিসাব হয়তো জোগাড় করা যায়নি।
অসংগঠিত ক্ষেত্রেই জড়িত রয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। এদের মধ্যে যেমন পরিযায়ী শ্রমিকরা আছেন, তেমনই আছেন ইঁটভাটার শ্রমিক বা শহর-গ্রামের রিক্সাচালক বা ছোটখাটো দোকানকর্মী। লকডাউন পর্বে এদের অনেককেই অনাহারে থাকতে হতো, যদি না বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ছাত্রছাত্রীরা এদের মধ্যে খাবার বিলি করতেন।
নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিচী ট্রাস্ট এই করোনাকালের শহরে আর গ্রামের মানুষের ওপরে কী ধরণের প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে গবেষণা করছেন।
প্রতিচীর গবেষক সাবির আহমেদ বলেন, ‘গ্রাম হোক বা শহর, গরীব মানুষদের মধ্যেও একটা আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে অনেকদিন ধরে যে ছেলে মেয়ে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ুক। কিন্তু অর্থনীতির অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে এই করোনাকালে যে অনেকেই এখন সরকারি বিনাবেতনের স্কুলে ভর্তি করানোর কথা ভাবছেন। তারা বেসরকারি স্কুলে যত কম বেতনই হোক, সেটা দিতে যে অপারগ এই অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে, সেটা আমাদের গবেষণার সময়ে দেখতে পাচ্ছি।’
তিনি জানান, ‘আবার এটাও দেখা যাচ্ছে স্কুলে মিড-ডে মিলের খাবার অনেক পরিবারের ছাত্রছাত্রীরাই খেত না। কিন্তু এখন শুকনো চাল-ডাল-আলু দেওয়া হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। সেটাই পরিবারের অন্ন সংস্থানের ক্ষেত্রে কিছুটা সাহায্য করছে এখন।’
সরকারি সূত্রগুলি বলছে যে তিন মাসে এই রেকর্ড সঙ্কোচন হয়েছে, তার পরেই শুরু হয়েছে আনলক পর্ব – যখন ধীরে ধীরে কলকারখানা খুলেছে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু হচ্ছে। আবার সরকারও নানা প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের হাতে কিছু কিছু অর্থ পৌঁছিয়ে দিয়েছে। তাই পরের তিনমাসে অর্থনীতি কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার বলছিলেন, ঘুরে দাঁড়ানোটা অত সোজা হবে না। তার কথায়, ‘প্রথমত মহামারিটা কতদিন চলবে আমরা জানি না। আর যতদিন মহামারি চলবে, ততদিন অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। আমার আশঙ্কা আরও একটা বা দুটো ত্রৈমাসিকেও নেতিবাচক বৃদ্ধি, অর্থাৎ সঙ্কোচন দেখতে পাব আমরা। একটা কারণ এখনও শ্রমিকদের ব্যবহার করা যাচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধির কারণে, তাই উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। আবার উল্টোদিকে যেসব ক্ষেত্রে শ্রমটাই সরাসরি পণ্য, যেমন পরিষেবার ক্ষেত্রে, সেখানে শ্রমের চাহিদাটাই কমে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো খুব সহজ নয়।’
তিনি বলেন, শুধু যে জিডিপির ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন তা নয়। যে সময়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেই একই সময়ে পুঁজির লগ্নিওকমেছে ৪৭ শতাংশষ। এখনও লগ্নি স্বাভাবিক নয়। আর লগ্নি না এলে উৎপাদন থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান- প্রতিটা দিক থেকেই ভারতের অর্থনীতির ওপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আগামী বেশ কিছুকাল।
প্রবাস বাংলা ভয়েস/ঢাকা/ ০২ সেপ্টেম্বর ২০২০/এমএম





